কৃষ্ণনগরের সাংসদ ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মহুয়া মৈত্রকে লোকসভা থেকে বহিষ্কারের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। জেনেভায় অনুষ্ঠিত ১৭৬তম ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (IPU) অধিবেশনে মৈত্রের বহিষ্কারকে "অবৈধ এবং অন্যায়" বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এই নিয়ে এখন উত্তাল দেশের রাজনীতি।
৮ ডিসেম্বর ২০২৩-এ লোকসভা ভোটের মাধ্যমে মৈত্রকে তার সাংসদ পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। অভিযোগ ছিল যে তিনি দারশন হিরানন্দানির কাছ থেকে উপহার এবং সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই বিনিময়ে লোকসভায় আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিজেপি এই অভিযোগকে "Cash for Query" নামে দাগিয়ে দেয়। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র প্রথম থেকেই আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। গৌতম আদানি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সরকারের সঙ্গে আদানি গ্রুপের সম্পর্ক নিয়ে তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন। আদানি গ্রুপের শেয়ার কারচুপির অভিযোগের পর, মহুয়া মৈত্র, রাহুল গান্ধী এবং জয়রাম রমেশ সরকারকে এই বিষয়ে তদন্ত শুরু করার দাবি জানান। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর আসার আগেই মৈত্র আদানি গ্রুপের সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
১৪ অক্টোবর ২০২৩-এ, ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জয় আনন্দ দেহদ্রাই সিবিআইয়ের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন এবং লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও তাদের নৈতিকতা কমিটিকে অভিযোগের অনুলিপি জমা দেন। তাদের অভিযোগ ছিল যে, মহুয়া মৈত্র দারশন হিরানন্দানির কাছ থেকে টাকা নিয়ে সংসদে আদানিকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
মৈত্র এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানান যে তিনি সিবিআই ও সংসদের নৈতিকতা কমিটির যে কোনো তদন্তকে স্বাগত জানাবেন। তিনি স্বীকার করেন যে হিরানন্দানি, যিনি তার বন্ধু ছিলেন, এবং তার নিজের অফিসের কিছু ব্যক্তির সাথে তিনি তার NIC পোর্টালের লগইন শেয়ার করেছিলেন, যা সংসদ সদস্যদের মধ্যে সাধারণ ঘটনা। তবে তিনি সংসদে প্রশ্ন করার জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। মৈত্রের দাবি, হিরানন্দানি হয় চাপের মুখে নয়ত পুরস্কারের লোভে এই অভিযোগ করেছেন এবং যারা আদানি-মোদী সংযোগের বিরুদ্ধে কথা বলছে তাদেরই টার্গেট করা হচ্ছে।
তারপর ভারতীয় রাজনীতিতে অনেক জল গড়িয়েছে, মহুয়া আরও একবার জিতে এসেছেন কৃষ্ণনগর কেন্দ্র থেকে, একই তীব্রতার সাথে লোকসভায় আজও চলেছে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তার লড়াই। আর এবার সেই লড়াইয়ে আরও একটু গতি পেলেন মহুয়া! ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ১৭৬তম ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (IPU) অধিবেশনে মৈত্রের বহিষ্কারকে "অবৈধ এবং অন্যায়" বলে ঘোষণা করা হয়েছে। IPU-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বহিষ্কারের প্রক্রিয়া যথাযথ আইনগত ভিত্তিতে গৃহীত হয়নি, এবং মৈত্রকে সঠিকভাবে আত্মপক্ষ উপস্থাপন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অভিযোগের কোনও স্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি এবং পুরো বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দ্বারা প্রভাবিত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মহুয়া মৈত্র গত কাল তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে লাল কালি দিয়ে মার্ক করা রিপোর্টের ছবি পোস্ট করে লেখেন - "বৈশ্বিক আন্ত-সংসদীয় প্রতিষ্ঠান ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (Inter Parliamentary Union বা IPU) আমার বিগত লোকসভা থেকে অবৈধ বহিষ্কারের ঘটনায় ভারতের তীব্র সমালোচনা করেছে...আমার বহিষ্কার ছিল 'অবৈধ অবৈধ অবৈধ'- এটাই IPU-র পর্যবেক্ষণ। সত্যমেব জয়তে!"
কি লেখা আছে সেই রিপোর্টে? বাংলায় তার মোটামুটি একটা সারাংশ তুলে ধরার চেষ্টা করল কৃষ্ণনগর ডট কম -
মূল বিষয়বস্তু:
-
অভিযোগের বিষয়বস্তু: মহুয়া মৈত্র অভিযোগ করেছেন যে তাকে যে প্রক্রিয়ায় বহিষ্কার করা হয়েছে তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ, পক্ষপাতমূলক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিশেষ করে, তিনি অভিযোগ করেন যে প্রশ্নোত্তর প্রক্রিয়াতে তাকে সঠিকভাবে নিজেকে প্রতিরক্ষা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ:
-
IPU জানিয়েছে যে মহুয়া মৈত্রকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেওয়া হয়নি।
-
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে কোনও স্পষ্ট প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
-
বিচার প্রক্রিয়া পক্ষপাতমূলক এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
-
কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে মৈত্রের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং তার বহিষ্কারকে অবৈধ বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়:
-
মহুয়া মৈত্রের বহিষ্কারের ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ায় সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
-
তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
-
IPU এই বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সমালোচনা ও সুপারিশ:
-
IPU ভারতীয় সংসদকে পুনর্বিবেচনা এবং সংশোধনের মাধ্যমে এই ধরনের বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
-
ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সংবিধানের আইন মেনে সবার অধিকার সমানভাবে রক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সারাংশে, মহুয়া মৈত্রের বহিষ্কারের ঘটনায় IPU-এর এই সমালোচনামূলক রিপোর্ট ভারতীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা এবং বিচারিক পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
প্রসঙ্গতঃ
ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU) হল একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন যা বিভিন্ন দেশের সংসদগুলির মধ্যে সহযোগিতা, সংলাপ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে গণতন্ত্র, শান্তি ও মানবাধিকারের প্রচার ও সংরক্ষণে কাজ করে।